পদ্মা সেতুতে টোল দিব না ফেরিতে যাব

পদ্মা সেতুতে টোল দিব না🥴 ফেরিতে যাব🥴🥴

ছবিটা ২০২১ এ আমার নিজের তোলা। পুরাতন ফেরি পদ্মা পার হবার সময় পুরাটা ঘুরে এমন পজিশনে ছিল যে আমি যেই ফেরিতে ছিলাম সেটার সব লোক চিৎকার করছিল। খুব অল্পের জন্য সরাসরি আঘাত থেকে বেঁচে যায় ফেরি দুটি।

এর আগের যাত্রায় যখন মাওয়া ঘাটে খুব ভোরে পৌছাই, তখন যে দৃশ্য দেখেছি সেটি যারা দেখেননি তারা কল্পনাও করতে পারবেন না। ছুটি সামনে রেখে আমি যেদিন ভোরে যাত্র শুরু করেছিলাম তার আগের রাতেই শত শত মানুষ ঘাটের কোড়ীডোড়গূলোটে ঝিমোচ্ছে। আগের রাত থেকে টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ছিল। মেঘলা আবহাওয়ায় শীতল বাতাস অনুভব করে হয়ত কোন কবি তখন শব্দের ছন্দ মেলাতে ব্যাস্ত। কিন্তু আপন মানুষের টানে বাড়ি ফেরার আনন্দে যারা আবহাওয়া উপেক্ষা করে ঘাট পার হবার জন্য এসেছিলেন তারা আটকা পড়ে যান। স্পিড বোট, লঞ্চ, ফেরি সব বন্ধ। ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে দূর থেকে এসেছেন হয়ত মানুষগুলি। বর্ষন ক্ষনে ক্ষনে বাড়ছে আবার একটু জিরোচ্ছে। তবে বৃষ্টির ঝাপটায় পলিথিন নিয়েও অনেককে দেখেছিলাম আপন পরিবারের মানুষগুলিকে ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচাবার বৃথা চেষ্টা করছে।

এর আগে যখন দৌলতদিয়া পাটুরিয়া রুট ব্যাবহার করতাম তখন ফেরি পার হতে এবং ঢাকা থেকে যশোরের ২৭৩ কিলোমিটার পার হতে আমার ব্যাক্তিগত সর্বোচ্চ ২৮ ঘন্টা লেগেছিল। অনেকের রেকর্ড আরো বেশি।

এই রুটের নিয়মিত যাত্রী হিসাবে দেখেছি এম্বুলেন্স গুলো ফিরে যাচ্ছে ঘাট পার না হতে পেরে অথবা রুগি পদ্মা পার হবার অপেক্ষায় ক্ষান্ত দিয়ে স্রষ্টার ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেছেন পৃথিবীর মায়া ছেড়ে। অনেকের অসুস্থ ভাই বোন বা বন্ধু, অনেকের মা-বাবা, অনেকের ছোট্ট শিশু এই ঘাটের বাধা পার হতে পারেন নি। তারা আর আমাদের মাঝে নেই। অবস্থা এরকম যে আপনি যদি কাউকে যদি বলেন, ভাই আমি ৫০,০০০ টাকা দিব আমার রুগিকে পার করে দেন, তাতেও কোন লাভ নেই। ঝড়ো হাওয়া, নাব্যতা না থাকা, শীতের ঘন কুয়াশা থেকে শুরু করে অনেক কারনে কিছুদিন পর পর ফেরি, লঞ্চ সব বন্ধ রাখতে হয়।

মাওয়া ঘাটের ক্ষেত্রে স্পিড বোটের ক্ষেত্রে মজার অভিজ্ঞতা বলি। আসলে সেতুর টোল নিয়ে তো মজা করছি এগুলা নিয়ে মজা করতে দোষ কোথায়? ছোট্ট স্পিড বোটে পদ্মা পার হওয়া যায়। আগে রাতেও চলত। অনেকগুলি দূর্ঘটনায় জীবনহানির পর রাতে এখন আর চলতে দেয়না। এই স্পিড বোটের জন প্রতি ভাড়া ১৫০ টাকা। পার হতে সময় লাগবে ২৫-৩০ মিনিট। এর জন্য যেটা করতে হবে সেটা হল ছোট ৮ জনের স্পিড বোটে চেপে চুপে ১৮ জন বসতে হবে। কারো লাগেজ বেশি থাকলে তার এই পন্থা নেয়ার সুযোগ নেই। তবে জীবনে যতবার স্পিড বোটে পার হয়েছি তার ভেতর মাত্র একবার ১৫০ টাকা দিয়ে পার হতে পেরেছি। সাধারনত ২০০/২৫০ এবং আমার ব্যাক্তিগত সর্বোচ্চ ৪০০ টাকা দিয়েও পার হতে হয়েছে। চমৎকার না? ফেরির যে ভাড়া এগুলার প্রকৃত ভাড়ায় কতজন পার হতে পারে জানিনা। ঘাটের চাঁদা, এই খরচ ওই খরচের নামে অনেক বাড়তি খরচ লাগে। রাতের বেলা ট্রাকের সিরিয়াল পেতে বা বাসের সিরিয়াল পেতেও গুনতে হয় ভাল একটা এমাউন্ট। শত শত কোটি টাকার ঘাট বাণিজ্য। খুব কষ্টদায়ক ব্যাপার হল সেতু চালু হলে এসবের সুযোগ আর থাকছে না।

লঞ্চে অবশ্য একেকজনের ভাড়ার ক্ষেত্রে বাড়তি টাকা আদায় দেখিনি। ৩৫ টাকা করে দিয়ে এসেছি। তবে দুই দুই বার বড় রকমের দূর্ঘটনা থেকে আল্লাহ বাঁচিয়ে দিয়েছেন। সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য।

মোটরসাইকেলের ফেরির ৭০ টাকা ভাড়ার সাথে সেতুর ১০০ টাকা ভাড়ার তুলনা দিয়ে অনেকে দেখছি বিশ্লেষন করা শুরু করেছেন। সেতুর টোল আগামী ১৫ বছরের জন্য নির্ধারিত। অর্থাৎ এখন যেই ১০০ টাকা দিয়ে পার হবেন সেটা ২০৩৭ সালে যেয়ে ১০% বৃদ্ধি পেয়ে ১১০ টাকা হবে। টাইম ভ্যালু অব মানি নিয়ে হিসাব কষতে আমাদের ভাল লাগে না। ওসব বুঝতে বা শুনতেও অনীহা। কিন্তু দেশের মিডিয়া গুলা পাবলিক ভাল খায় এরকম শিরোনাম আর বিশ্লেষন করতে ব্যাস্ত। সেতু নির্মানের বিনিয়োগের টাকা উঠাতে গেলে বাস্তবে টোল আরো বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু সেটার জন্য বৃদ্ধি পাওয়া ট্রাফিকের হিসাব করে হয়ত সমন্বয় করা হয়েছে।

যেভাবে এই দেশে একেকটি প্রকল্পকে বিতর্কিত করা হচ্ছে এগুলার উদ্দেশ্য নিষ্পাপ নয়। প্রয়োজনীয় তথ্য বিশ্লেষন মানুষের পাবার অধিকার আছে। নামকরা পত্রিকা গুলি যেভাবে নেতিবাচক ভাবে মানুষের চিন্তায় প্রভাব রাখছে সেটা ভয়ের ব্যাপার।

নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর শিরোনামগুলি এমন ভাবে করা হচ্ছে, বিশ্বাস করুন, নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিত মানুষজনকেও একি কথা বলতে শুনেছি নিজস্ব অর্থায়নে সেতু হলে টোল দিব কেন? এই যে ভুল বিশ্লেষন গুলি মানুষের ভেতর ভুল ধারনার জন্ম দিচ্ছে সেটার জন্য দায়ী কাকে করা যায়?

অনেক পত্রিকায় দেখলাম ৩০ বছর আগের প্রকল্প যমুনা সেতুর টোলের সাথেও তুলনা করছে। চিন্তার লেভেল দেখলে অবাক না হয়ে পারা যায় না।

বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়ন বন্ধ হবার সময় যখন সরকার দেশীয় উৎস থেকে অর্থ সংস্থানের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তখন দেশের শীর্ষ পত্রিকায় কার্টুনিস্টরাও মজা নিয়েছিল। ছোট অর্থনীতিকে টেনে চিপড়ানোর পরো যেন এই অর্থ ম্যানেজ করা পসিবল না ঠিক এরকম একটি বার্তা ছিল বোধহয়।

তবে এই সেতু নির্মানের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বেশ বড় একটা প্রভাব নিয়ে এসেছে। এই সেতু নির্মানের আগে মাত্র ৫০০ বা ১ হাজার কোটির প্রকল্প হাতে নিতে গেলেও বিশ্ব ব্যাংক ওভারলর্ড ভাব দেখাতো। দাতা সংস্থা শব্দটা ফলাও করে প্রচার হত। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের সাথে চীনের একটা সম্পর্ক আছে বোধহয়। এই একটি প্রকল্পের হাত ধরেই চীনের শক্ত উপস্থিতি এদেশে বেড়েছে। বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ, আমেরিকা, দাতা গোষ্ঠী, ভারতের মত দেশের যে নিয়ন্ত্রন আর কঠোর হুমকি ধামকি, সেই পরিস্থিতি থেকে চীন বাংলাদেশকে বেরিয়ে আসতে ভূমিকা রেখেছে। ২০১৬ সালে শি জিন পিং এর সফর ও ২৪ বিলিয়নের চুক্তি নিয়ে মোটামুটি পশ্চিমা ও প্রতিবেশি দেশগুলির রিয়েকশন ছিল দেখার মত।

সেতুটার সাথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা/আওয়ামীলিগ অথবা বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রসঙ্গ টেনে রাজনীতির চেষ্টা বন্ধ করুন। জাতীয় ইস্যু গুলাতে রাজনীতি (কুটনি নীতি) বন্ধ না হলে আমরা এগোতে পারব না। সেতুটি যেই দল করুক না কেন, তারা ধন্যবাদ পাবার অধিকার রাখে। সেটা প্রয়াত এরশাদ সাহেব করলেও যেমন ধন্যবাদ পেত, মেজর জিয়া করলেও ধন্যবাদ পেত। এর কারন হল, আমরা যারা প্রতিনিয়ন জীবনের ঝুকি নিয়ে এই পথ পাড়ি দেয়ার সাক্ষী তারা বুঝি এর মূল্য। এটা অমূল্য। ২১ জেলা বাংলাদেশের অন্য অঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন। সেটি জোড়া লাগছে। অপেক্ষার সময়, কষ্টের সময়, আবহাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকবার সময় হয়ত শেষ হতে চলেছে ইনশাল্লাহ।

সেতুর টোল হার নিয়ে ২ বছর আগেও লিখেছিলাম। এই পেজের শুরুর দিকেও লিখেছিলাম কয়েক মাস আগে। সেসব ইকোনমিক ডাটা বিশ্লেষন আর স্পিল ওভার ইফেক্ট নিয়ে আর লিখছি না। বিগত দেড় বছর নিজের বাড়ি যাইনা এই পদ্মা পার হবার চিন্তার কারনে। নিজের ক্ষেত্রে ঝুকি নিতে সমস্যা নেই। কিন্তু পরিবার নিয়ে ঝুকি নেয়ার সাহস এখন হারিয়ে ফেলেছি। অপেক্ষায় আছি শুভক্ষণ আসার।

বাংলাদেশ এগিয়ে যাক।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.