ভহ্মক। লেখিকা অধরা অহনা

#ভক্ষক
#তমালিকা_ঘোষাল_ব্যানার্জী

“মা, তুমি সায়নমামাকে আসতে বারণ করে দাও।” বলে তিন্নি।

“কেন সোনা? সায়নমামা কতো ভালোবাসে তোমায়, কতো গল্প বলে। আসতে বারণ করব কেন?”

ছোট্ট তিন্নি মাকে বুঝিয়ে উঠতে পারে না যে সায়নমামার আচার-আচরণ তার মোটেও ভালো লাগে না। গল্প বলতে বলতে সায়নমামা তাকে যেভাবে স্পর্শ করে, তার চরম অস্বস্তি হয়, কান্না পায়।
অগত্যা চুপচাপ নিজের ঘরে চলে যায় তিন্নি।

সুতনুকারও কাজের ফাঁকে ফুরসৎ নেওয়ার সময় নেই। সংসারের কাজ, অফিসের কাজ, তিন্নির পড়াশোনা — এসব তো আছেই। এর সঙ্গে আছে আবার তার যমজ সন্তান, ন’মাস বয়স তাদের। তাও কিছুটা সুবিধা যে ওয়ার্ক ফ্রম হোম করছে। স্বামীও কাজকর্মে সাহায্য করে দেয়। বাচ্চা দেখাশোনার জন্য সর্বক্ষণের আয়া খুঁজেছিল খুব করে, কিন্তু ক’ঘণ্টার বেশি কেউই থাকতে রাজি নয়, তাই ওভাবেই চলছে। মালতী ঘরের কাজকর্ম করে দিয়ে চলে যায় আর রেবা বাচ্চা সামলে বিকালে বিদায় নেয়।

স্বামীর অফিসের কাছে এই বাড়িটায় ভাড়া এসেছে সুতনুকারা। যতো কাছে হয়, ততো সুবিধা। দোতলা বাড়ি, পুরোটাই ভাড়া নিয়েছে ওরা। ভাড়া তেমন বেশিও নয়, এটাই অবাক হওয়ার বিষয়। সে যা হোক, তাতে বরং ভালোই হয়েছে। তবে চিলেকোঠার ঘরে যেতে মানা, ওখানে বাড়ির মালিকের কিছু পুরোনো আসবাবপত্র থাকায় ওই ঘরটা অব্যবহার্য্য হয়েই পড়ে আছে।

এত ব্যস্ততার মধ্যে সায়ন এলে সুতনুকার কিছুটা সুবিধা হয়। এখানে নতুন আসায় তিন্নির কোনো বন্ধু নেই। সায়নই যা গল্প করে ওর সঙ্গে, খেলে। মাঝেমধ্যে আসার সময় ওকে দরকারি টুকটাক জিনিস কিনে আনতে দেয় সুতনুকা। ওর বাপেরবাড়ির পাড়ার ছেলে সায়ন, সেই সূত্রে সে তিন্নির সায়নমামা। এখানে কাছেই ওর অফিস, কিছু দূরের একটা ফ্ল্যাটে থাকে।

পরেরদিনই সায়নের আগমন হয়।
“তিন্নি কোথায় গো তনুদি?”

“দেখ কোথায় বসে খেলছে..” ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলে সুতনুকা।

সায়ন ঠিক খুঁজে খুঁজে বার করে তিন্নিকে।
“ওকি, তিনতলায় কি করছো? নেমে এসো।”

তিন্নি মাথা নাড়ে।

“আচ্ছা, আমিই তাহলে যাচ্ছি।” সায়ন চিলেকোঠার ঘরের দিকে এগিয়ে যায়।

তিন্নিকে ধরে কোলে বসিয়ে বলে, “আজ আমি তোমায় বলবো শেয়াল আর ছাগলছানার গল্প..”

…………………………………………………………………….

সকাল থেকে চূড়ান্ত ব্যস্ত সুতনুকা, আজ ভাইফোঁটা। সায়নকে ফোঁটা দেবে বলে নিমন্ত্রণ করেছে তাকে। স্বামীকে দোকানে পাঠিয়েছে মিষ্টি কিনতে। সত্যি, এখনকার দিনে কে কার খোঁজ রাখে। সায়ন নিজের ভাই না হয়েও যথেষ্ট করছে, তাই আজ এই আয়োজন।

একটু পরেই সায়ন এসে যায় আর উৎসুক চোখে তিন্নিকে খুঁজতে থাকে। সারাবাড়ি খুঁজে না পেয়ে পৌঁছে যায় তিনতলার ঘরে, দেখে তিন্নি জানলার ধারে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

“একি, একা একা কি করছো এখানে?” সায়ন শুধোয়।

তিন্নি সাড়া দেয় না।

তিন্নিকে নিজের কাছে টেনে আনে সায়ন। এই ঘরটা একদিক দিয়ে তার সুবিধাই করেছে, ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় নেই।
“আজ কোন গল্পটা শুনবে বলো..”

সায়নের চোখের দিকে তাকিয়ে তিন্নি বলে ওঠে, “সায়নমামা, আজ বরং আমি একটা গল্প বলি। তুমি শোনো।”

তিন্নির কথায় তার সায়নমামা কৌতুক বোধ করে, তিন্নির কোমরটা ধরে আরো কাছে নিয়ে আসে তাকে।
“বলো।”

সায়নের দিকে চেয়ে মিটিমিটি হেসে তিন্নি গল্প শুরু করে..
“একটা শেয়াল ছিল, নিজেকে খুব চালাক ভাবতো। কুমিরের বাচ্চাদের পড়ানোর অছিলায় সে তার সবক’টা বাচ্চাকে খেয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়..”

সায়ন হাসতে থাকে, “এ গল্প তো আমি জানি।”

“আরো আছে, সেটা কিন্তু তুমি জানো না।”

তিন্নি বলতে শুরু করে, “শেয়ালটার সাহস বেড়ে যায়। ঘুরতে ঘুরতে দেখে একটা হায়নার গুহা, ভেতরে হায়নাটা হাঁ করে ঘুমোচ্ছে। সাহস দেখাতে সে সেই হায়নার মুখের ভেতর হাত রাখে।”

সায়ন কৌতূহলী হয়, “তারপর?”

“হায়নাটা অমনি জেগে উঠে এক কামড়ে তার হাতখানা খেয়ে ফেলে, ঠিক এইভাবে..” বলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে সায়নের ডানহাতের কব্জি থেকে কামড়ে ছিঁড়ে নেয় সে।

আর্তনাদ করে ওঠে সায়ন। দেখে তার সামনেই ক্লাস ওয়ানের ছোট্ট তিন্নি হাসিমুখে তার হাতখানা কেমন আয়েস করে কামড়ে কামড়ে খাচ্ছে। তারপর তার দিকে এগিয়ে আসে। সায়নের টুঁটি চেপে হাঁ করিয়ে তার কাটা হাতের আঙ্গুলগুলো ছিঁড়ে নিয়ে ভেঙেচুরে তার মুখেই ঠুসে দেয় তিন্নি, গিলতে বাধ্য করে।

রক্তে মাখামাখি হয়ে টলতে টলতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসে সায়ন। ওই দেখে সুতনুকা, মালতী আর রেবা ভয়ে চিৎকার করে ওঠে। ততক্ষণে সুতনুকার স্বামীও ফিরে এসেছে। কাটা হাতের যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে সায়ন দেখে বাবার হাত ধরে তিন্নি ভয়ার্তদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে, বাবার সাথে সেও দোকানে গিয়েছিল।

…………………………………………………………………….

তিন্নির সায়নমামার মানসিক রোগের চিকিৎসা চলছে। নয়তো নিজের হাত কেউ ওভাবে খায়! পরীক্ষানিরীক্ষায় সায়নের হাতের অংশ তারই পাকস্থলীতে পাওয়া গেছে, কথাবার্তাও অসংলগ্ন। তাই তার মানসিক অসুস্থতার ব্যাপারে চিকিৎসকরা নিশ্চিত।

মালতী অবশ্য সুতনুকাকে জানাতে ভুলে গেছে, বহুবছর আগে ওই চিলেকোঠার ঘরে এবাড়িরই এক ভাড়াটে বউ আত্মহত্যা করেছিলো। এমনিতে সুতনুকারা ভালোই আছে ওই বাড়িতে, কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি। মালতীও সায়নকে মানসিক রোগীই ধরে নিয়েছে।

তিন্নি এখন রোজ বিকালে পার্কে খেলতে যায়। অনেকগুলো বন্ধু হয়েছে ওর, ওরই সমবয়সি। তাদের সঙ্গে খুশিমনে খেলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.